গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা

আচ্ছালামু আলাইকুম NEW NCP এর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

 গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা, 

আমাদের দেশের  অনেক গর্ভবতী মা তেমন সচেতন নয় এতে অনেক সময় অঘটন ঘটে তাই গর্ভকালে স্বাস্থ্যচর্চা মা ও পেটের শিশুর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এ জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মাঝে অবশ্যই খেয়াল রাখতে তবেই একজন গর্ভবর্তী মা সুস্থ থাকবে এবং সুস্থ সন্তান প্রসব করবে।

গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা

খাদ্য : পুষ্টির মূল ও উৎস হলো খাদ্য। গর্ভবতী মা ও শিশুর দু জনের সমান পরিমাণ খাবার প্রয়োজন নেই। পরিমাণে খুব বেশি না খেয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে খেতে হবে, যাতে সীমিত পরিমাণ খাদ্য মা ও শিশু উভয়ের পুষ্টির প্রয়োজন মেটায়। এ সময় সারাদিন ২,৫০০ থেকে ২,৯০০ ক্যালরি খাবার প্রয়োজন হয়। গর্ভধারণের আগে মুখে যা কিছু ভালো লাগতো মা তাই খেতেন। এখন, এ গর্ভাবস্থায় তার খাবার এমন হতে হবে যে তার খাবারে বেশি পরিমাণ পুষ্টিকর জিনিস থাকে, যাতে করে মা ও শিশু উভয়েরই স্বাস্থ্য ভালো থাকার সুযোগ পায়। পুষ্টির জন্য শিশুর যা কিছু এবং যতটুকু পরিমাণ দরকার, তার সবটুকুই সে নেয় তার মায়ের শরীর থেকে। তাই শিশুর যা প্রয়োজন সেটা সে মার কাছ থেকে সংগ্রহ করে।

 এমন কি তাতে মায়ের শরীর কর্তৃক সংগৃহীত বস্তু, যেমন: ক্যাসিয়াম কিংবা লৌহ যদি কমে যায়, তবুও শিশু তার ভাগ ঠিকই সংগ্রহ করে নেবে। শিশুর এই গ্রহণের হার দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং গর্ভাবস্থার শেষ দিকে হঠাৎ করে তার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। এজন্য খাবারে শ্বেতসারের, যেমন : ভাত, রুটি, আলু, চিনি, গুড় এসবের চেয়ে আমিষ, যেমন : মাছ, মাংস, ডাল, ডিম এবং ভিটামিন ও খনিজ জাতীয় পদার্থ, যেমন : লৌহ, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি এবং সময় বেশি পরিমাণ থাকা প্রয়োজন।

 আমিষ জাতীয় খাবারের মধ্যে আবার দুই-তৃতীয়াংশ খনিজ উৎসের আমিষ হলে ভালো হয়। যেমন : মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম। মা'র খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণ টাকা শাক-সব্জি, ফল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ অবশ্যই থাকে। মোটা ভুসিযুক্ত আটার তৈরি রুটি ও ঢেঁকিছাঁটা চাল, শাক-সবজি ও টাটকা ফল খুবই উপকারী। কচুর লতা, কাঁচা কলা, বরবটি, শিম, লালশাক, পালংশাক, কচু শাক ও অন্যান্য সবুজ পাতাওয়ালা শাক, কলিজা এবং পেয়ারায় প্রচুর পরিমাণে লৌহ থাকে। তাই এগুলো খেলে রক্তশূন্যতা দূর হয়।

ওষুধ সেবন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আপনি কখনো কোনো ওষুধ খাবেন না। বিশেষ করে গর্ভবতী হবার প্রথম ৩ মাসের মধ্যে খুব জরুরী ক্রিয়া শিশুর শরীরে অনিবার্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, গর্ভবস্থায় শিশু মায়ের শরীর থেকেই খাবার সংগ্রহ করে । কোনো কোনো ওষুধ ভ্রূণ গঠন বিকৃতিকারক।

দাঁতের যত্ন

দাঁতের যত্ন নেওয়া গর্ভাবস্থায় খুবই জরুরী। এ সময় দাঁত খুব পরিষ্কার রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় দাঁতের মাড়ি ও দাঁতের গোড়ালি খুব নরম থাকে।

তাই ব্রাশ করার সময় মাঝে মাঝে বেশ রক্ত পড়ে। গর্ভের শিশু যেহেতু তার নিজের শরীর গঠনের জন্য মায়ের শরীর থেকে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে, ' তাই মায়ের দাতের ও হাড়ের ক্যালসিয়াম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য বেশি পরিমাণে দুধ, ঘি, মাখন, ছোট মাছ কাঁটাসহ চিবিয়ে খেলে এ ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয়।

চলাফেরা

এ সময় চলাফেরায় খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে জায়গা বা গোসলখানায় যাতে পা পিছলে না যায়, তার দিকে গর্ভবতী মায়েদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, পতন জনিত আঘাত মা ও শিশু উভয়েরই বিরাট ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ সময় উঁচু গোড়ালি যুক্ত জুতো পরা বাদ দিতে হবে।

গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক কাজ-কর্মে কোনো বাধা নেই। তবে এমন কাজ করা উচিত নয়, যাতে খুব বেশি পরিশ্রম হয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ভারি কিছু ওঠানো কোনো ক্রমেই উচিত নয়। নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে স্বাভাবিক কাজ-কর্ম ব্যায়ামের বিকা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে পরিমিত ব্যায়াম মা ও শিশু উভয়ের জন্য উপকারী। এ সময় সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠা-নামা করা, ভারি জিনিসপত্র ওঠানো কিংবা ওপরের দিকের কোনো জিনিস ধরার চেষ্টা না করাই উচিত।

যোনিপথের কোনো রোগ

গর্ভাবস্থায় যোনির নিঃসরণ বেড়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত যোনি নিঃসরণ বিশেষত দুর্গন্ধযুক্ত বা চুলকানি থাকলে কিংবা যোনিপথের জন্য কোনো ধরনের রোগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে সেসব পরামর্শ করে প্রসবের আগেই আরোগ্য লাভ করতে হবে। নতুবা প্রসবের সময় যোনিপথের রোগ শিশুর চোখে, নাভিতে বা শরীরের নানা জায়গায় আক্রমণ করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, গনোরিয়া রোগ যোনিপথ থেকে শিশুর চোখে সহজেই সংক্রমিত হয় এবং কয়েকদিনের

মধ্যেই শিশু অন্ধত্ব বরণ করতে পারে। ফাংগাস্ যোনিপথ থেকে শিশুর মুখে

সংক্রমিত হতে পারে।

যৌন সম্পর্ক

গর্ভাবস্থায় প্রথম ও শেষের দিকে যত কম যৌন মিলন হয় ততই ভালো। প্রথম ও শেষের দিকে রোগ সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়া প্রথম দিকের আর একটা বিপদ হলো যে, যৌন মিলনের ফলে অকাল গর্ভপাতের সম্ভাবনাও থাকে। গর্ভাবস্থায় পেটের উপর যাতে চাপ বেশি না পড়ে তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। শেষের দিকে সঙ্গমে অসুবিধা বোধ করলে অবশ্যই আসন বদল করে নিতে হবে।

প্রয়োজনীয় ডাক্তারী পরীক্ষা

যে তারিখে মাসিক হওয়ার কথা ছিল সেই তারিখ থেকে ২ সপ্তাহ পার হলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। আপনি গর্ভবর্তী হলেন কিনা সেটা জানার জন্য। গর্ভবতী হলে তারপর থেকেই মাতৃমঙ্গল ও ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রত্যেক মাসে নেওয়া খুবই জরুরী। ৮ মাসের পর থেকে এ পরামর্শ ১৫ দিন পরপর নেওয়া উচিত। এ ছাড়াও যদি কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন পা ফোলা, রক্তশূন্যতা, রক্তক্ষরণ, পানি ভাঙা, মাথা ব্যথা, বমি ইত্যাদি, তবে দেরী না করে ডাক্তার দেখাতে হবে।

প্রত্যেকবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর ডাক্তার আপনার রক্তের চাপ ওজন, নাড়ির অবস্থা, রক্তশূন্যতা, শরীর ফোলা ইত্যাদি আপনার শিশুর বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা, সেটা পরীক্ষা করে দেখবেন, শুনবেন আপনার প্রয়োজনে তিনি আপনার পেশাব ও রক্ত পরীক্ষা করতে দিবেন। সর্বোপরি এ সময় ডাক্তারের সাথে সকল বিষয়ে সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে।

ল্যাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

গর্ভাবস্থায় কোনো সমস্যা আছে কিনা যেমন, রক্তশূন্যতায় ভুগছেন কিনা কিংবা তার প্রসবে কোনো অসুবিধা আছে কিনা, সেটা খতিয়ে দেখার জন্য অন্ত তপক্ষে ৩ বার (প্রথম দিকে, মাঝামাঝি সময়ে এবং শেষের দিকে) হিমোগ্লোবিন্ ও পেশাব পরীক্ষা করা একান্ত দরকার। এছাড়াও যদি কখনো রক্তশূন্যতা বা রক্তক্ষরণ হয় কিংবা পেশাবে জ্বালাপোড়া করে, বারবার পেশাব হয় বা হাত-পা ফুলে যায়, তবে অনতিবিলম্বে পেশাব পরীক্ষা করতে হবে। প্রথম প্রথম গর্ভধারণকালে কতগুলো বিশেষ পরীক্ষার দরকার হয়, যেমন রক্তের গ্রুপ এবং

আর.এইচ. নির্ধারণ ইত্যাদি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে আপনার চিকিৎসকই আপনাকে যে পরামর্শ দিবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক্স-রে না করা

সাধারণত গর্ভাবস্থায় এক্স-রে যত কম করা যায় ততোই ভালো। তবে কখনো কখনো কতগুলো কারণে এক্স-রে করার দরকার হয়। সাধারণত সাড়ে ৭ মাসের পর একবার কিংবা দু বার এক্স-রে করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই প্রথম ৩-৪ মাস এক্সরে করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

আলট্রাসনোগ্রাম বা অতিশব্দ স্ক্যানিং

এ পদ্ধতি আমাদের দেশে নতুন ব্যবহৃত হচ্ছে। গর্ভাবস্থায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করা নিরাপদ। গর্ভবতী মেয়েদের জন্য এ পদ্ধতির বিশেষত্ব এই যে, এতে মা বা ভ্রূণের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। এর দ্বারা ভ্রূণের অবস্থান, বয়স, ফুলের অবস্থান ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক অবস্থা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় ।

সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময়

সাধারণত গর্ভকাল ২৮০ দিন বা ৪০ সপ্তাহ বা ৯ মাস ৭ দিন স্থায়ী হয়। চিকিৎসকরা শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে গণনা করে ৯ মাস ৭ দিন পরে যে কোনো সময়ে সাধারণত শিশু ভূমিষ্ঠ হতে পারে। প্রথম গর্ভবতীর বেলায় অনেক সময় কিছুটা আ গেই প্রসব হয়। এ ছাড়াও ব্যতিক্রম আছে। গর্ভাবস্থার আগে যদি কোনো মহিলার মাসিক নিয়মিত ২৮ দিন পরপর না হয়, তাহলে সম্ভাব্য তারিখের আগে কিংবা পরেও শিশু ভূমিষ্ঠ হতে পারে। শেষ মাসিকের প্রথম দিনটা স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য মনে রাখা বিশেষভাবে জরুরি।

মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় জরায়ু মাঝে মাঝে সঙ্কুচিত হয় এবং শেষের দিকেএ সংকোচন জোর বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে ঘন ঘনই তা চলে। প্রথম দিকে এ সঙ্কোচনের জন্য কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। কিন্তু একেবারে শেষের দিকে কিছুটা ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ব্যথা শুরু হলে এ সংকোচন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া বা প্রয়োজনে হাসপাতালে • হওয়ার এটাই প্রকৃত সময়। হাসপাতালে নিতে দেরি হলে অনেক সময় রাস্তায় ভূমিষ্ঠ হতে পারে। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় এবং

মারাত্মক বিপদের সম্ভাবনা থাকে। সর্বোপরি শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ব্যথা শুরু হলেই সার্বক্ষণিক  ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং তরল খাদ্য চারা অন্য কিছু খাওয়ানো উচিত হবে না। 

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
🟢 কোন মন্তব্য নেই
এই পোস্ট সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানান

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন - অন্যথায় আপনার মন্তব্য গ্রহণ করা হবে না।

comment url